Friday, February 15, 2013

তাহরির স্কয়ার যা ভেঙেছে শাহবাগ স্কয়ার তা-ই জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে

তাহরির স্কয়ার থেকে শাহবাগ স্কয়ার। এই দুই স্কয়ারের মিলগুলো হলো, ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার প্রভৃতি এই উভয় স্কয়ার সৃষ্টি করেছে। নেতৃত্বে এসেছে অপরিচিত তরুণ ব্লগাররা। দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে দিবারাত্রি অবস্থান একটা ভিন্ন আমেজ যোগ করেছে।

তবে বড় অমিলটি হলো, তাহরির স্কয়ারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রশক্তি ছিল খড়্গহস্ত। আর শাহবাগ স্কয়ারে রাষ্ট্রশক্তি মূল পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়োজিত। এখানে পুলিশের মরিচের গুঁড়ার স্প্রে নেই। ভীতিকর ঘোড় সওয়ারীরা নেই। বন্দুকের গুলি বা বোমার আঘাতে ঝাঝরা হওয়ার ভয়টি নেই। বরং তৃষ্ণা নিবারণের জন্য আছে সুশীতল মিনারেল ওয়াটার। আছে খাবারের আরামদায়ক সরবরাহ। আছে মৌসুম ও প্রকৃতির দান নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ। আছে মিডিয়ার পুষ্প অর্পণ। আছে সুশীল সমাজের আশীর্বাদ। আছে সিনেমা, নাটক ও গান শোনার সু-বন্দোবস্ত।
আছে টিভিতে চেহারা দেখানোর ও বক্তব্য রাখার অপূর্ব সুযোগ। গতকাল যে লাকিকে কেউ চিনত না, সেই লাকির লাক বা ভাগ্য আজ খুলে গেছে। মতিয়া চৌধুরী ছিলেন এনালগ অগ্নিকন্যা। তার জন্য অনেক সাধনার দরকার হয়েছিল। এই লাকিদের ডিজিটাল ‘অগ্নিকন্যা’ বানানো হয়েছে চোখের নিমিষে। বোধগম্য কারণেই ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের এই অগ্নিকন্যার মাথা ফাটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে।

উত্সাহী মিডিয়া ও উত্ফুল্ল সুশীল সমাজ এটাকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেও তুলনা করে বসেছেন। ২০১৩ সালে নতুন প্রজন্ম নাকি এর মাধ্যমে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের স্বাদটি আস্বাদন করছে! অনেকটা পিকনিকের আমেজ দিয়ে কঠিন সেই মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করার শামিল।

তবে একটা গ্রুপ কোলকাতার হোটেলে বা শরণার্থী শিবিরে অনেকটা এ ধরনের পিকনিকের আমেজ আস্বাদন করেছেন। মেজর জলিল তার বইয়ে সুন্দরভাবে সেই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এই অপরাধে একজন সেক্টর কমান্ডার হয়েও তিনি বীর উত্তম খেতাব না পেয়ে রাজাকার-উত্তম খেতাব পেয়েছেন।

জহির রায়হান এ সংক্রান্ত কিছু ডকুমেন্টস সংগ্রহ করেছিলেন। একটি প্রামাণ্য চিত্রের মাধ্যমে তা তুলে ধরার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়ায় তিনি আর সেই সুযোগটি পাননি। স্বাধীনতার প্রায় ৪৪ দিন পরে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে এক বর্গমাইল অঞ্চলও তখন পাক সেনা বা তার দোসরদের অধীনে ছিল না। তার এই নিখোঁজ হওয়াটি এখনও রহস্য হয়েই আছে।

পিকনিক আমেজের বাইরে অন্য একটি বিশাল দল ছিল উত্তপ্ত যুদ্ধের ময়দানে। সেটা ছিল তাহরির স্কয়ারের চেয়েও হাজার লক্ষ গুণ উত্তপ্ত। তদানীন্তন মেজর জিয়া, মেজর জলিল, বাঘা সিদ্দিকী সবাই ছিলেন এই তপ্ত মাঠে। ঘটনাক্রমে এরা সবাই একের পর এক রাজাকার খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় আক্রমণ করা হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষক, জেড ফোর্সের অধিনায়ক ও অন্যতম সেক্টর কমান্ডার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াকে। যুদ্ধের সময় তাকে লেখা জনৈক পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তার চিঠিও আবিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। পাকিস্তানি ওই সেনা কর্মকর্তা ওই চিঠিতে জিয়ার কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে যদি পাক বাহিনী হাত করে ফেলতে পারত তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে এই নির্মম পরাজয়টি কখনই বরণ করতে হতো না। স্বাধীনতা যুদ্ধে মাত্র নয় মাসে আমাদের এই বিজয়, কমান্ড লেভেলে ইস্পাত কঠিন ঐক্য ও শৃঙ্খলাটি তুলে ধরে। কাজেই এই প্রচেষ্টাটি শুধু ঐতিহাসিক সত্যের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে না—এটা কমন সেন্সের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

ভয়ঙ্কর দিকটি হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রোথিত করার নামে একটা গ্রুপের মাঝে এই ধরনের মাইন্ড সেট তৈরি করা হয়েছে। এই মাইন্ড সেটটি বিপরীত ধারার কোনো কথা শুনতে চায় না। কল্পনার জগতটিও এদের বড়ই রহস্যময়। দেলোয়ার জাহান ঝন্টুদের সিনেমার কাহিনীর মতো এরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বানায়। এদের বাঘা বাঘা গবেষকদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা দেখলে সত্যি করুণা হয়। তাদের লেখা ইতিহাস পড়ে আমরা ভয়ে যে প্রশ্ন করি না সেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভাইয়ের নাত্নী শর্মিলা বসু। সেসব প্রশ্ন অনেক বিব্রতকর। পাকিস্তানের টাকা খেয়ে এসব লেখেছেন বলে আমরা সেসব প্রশ্ন ধামাচাপা দিয়ে রেখেছি।

শাহবাগ স্কয়ারে একটা তাহরির স্কয়ার হয়েছে জেনে অতি খুশি হয়েছিলাম। তারুণ্যের ধর্মই হলো ভয় ও শঙ্কাহীন থাকা। তারুণ্যের ধর্মই হলো সব অত্যাচার, উত্পীড়ন, অনাচার, কুপমণ্ডুকতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কিন্তু হতাশ হয়েছি এই তারুণ্যের সেই খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি দেখে। চল্লিশ বছরের আগের মানবতাবিরোধী অপরাধ এই তারুণ্যকে স্পর্শ করেছে এটা অবশ্যই আনন্দের। তবে বর্তমানের দিকে শাহবাগের এই তারুণ্য বড্ড বেশি উদাসীন।

এ দেশের কোনো সরকারের আমলনামাটিই পরিষ্কার নয়। তারপরেও বর্তমান সরকারের আমলনামা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বাজিকর, টেন্ডারবাজ, দখলবাজ, চাপাতি লীগ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আর এরা পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে।

শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর হাহাকার এই তারুণ্যের কানে পৌঁছায়নি। হলমার্ক এই দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে তছনছ করে ছেড়েছে, সেই ক্রোধ শাহবাগ স্কয়ারের এই তারুণ্যকে স্পর্শ করেনি। পদ্মা সেতুতে আবুল নামক ইঁদুরেরা পুরো জাতির ভাগ্যের শিকাটি ছিঁড়ে ফেলেছে, সেই হতাশা এই তারুণ্যকে ছুঁতে পারেনি। কুইক রেন্টাল এ জাতির গলায় যে ফাঁস লাগিয়েছে, সেই কষ্ট এই তারুণ্যকে নাড়া দিতে পারেনি। সাগর-রুনীর ট্র্যাজেডি এই তারুণ্যের দ্রোহে একটুও দোলা লাগাতে পারেনি। গুম ও খুনের কারণে শত শত নারী ও শিশুর কান্না বাতাসে ভাসছে, তারুণ্যের কানে সেই আহাজারিগুলো পৌঁছতে পারেনি।

কাজেই প্রশ্ন, এরা কি সেই তারুণ্য নাকি তারুণ্যের বেশে সেই জরা বার্ধক্য? যারা ভিন্ন মতাবলম্বীর উদ্দেশ্যে বলে, ‘বিচার টিচার আবার কী, এদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলেই হয়।’ বার্ধক্যপীড়িত মন্ত্রীদের উচ্চারণের সঙ্গে এই তারুণ্যের উচ্চারণ দাড়ি-কমাসহ মিলে গেছে। সেই জরা-বার্ধক্যের প্রভাব কাটিয়ে এই তারুণ্য মূল যুদ্ধাপরাধী ইয়াহিয়া, ভুট্টো, নিয়াজী, টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলীদের নামগুলো উচ্চারণ করতে পারছে না। পারছে না পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিষয়টি সামনে আনতে। টক-দইওয়ালা গল্পের মতো হানিফ ও সাজেদা চৌধুরীকে সামান্য বিব্রত করা ছাড়া এই তারুণ্য সরকারকে বিব্রত করার জন্য একটা কাজও করছে না। বরং এসব ঢেকে ফেলার জন্য যুদ্ধাপরাধের বিচারের আবেগটি ব্যবহার করছে।

‘তোমার সঙ্গে আমি ভিন্নমত পোষণ করতে পারি। কিন্তু তোমার এই মত প্রকাশের জন্য জীবন দিতে রাজি আছি।’ এই কথাটি কোনো জরা-বার্ধক্য উচ্চারণ করতে পারে না। এই কথাটি উচ্চারণ করতে পারে একমাত্র তারুণ্য। কিন্তু শাহবাগ স্কয়ার থেকে আমরা এ কী শুনছি? সেখান থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী পত্রিকা ও টিভি বন্ধ করার হুমকি দেয়া হয়েছে। হুমকি দেয়া হয়েছে বিরোধী দলের ব্যবসা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো দখলের। এই বুড়োরা এতদিন যা বলে এসেছে শাহবাগ স্কয়ারের এই তারুণ্য দেখা যাচ্ছে হুবহু সেই একই কথা বলছে।
মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা হরণ করেছিল হোসনি মোবারকের বাকশাল। সেই বাকশাল ভাঙার জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল তাহরির স্কয়ার। প্রকারান্তরে সেই বাকশালকে নতুনভাবে জোড়া লাগানোর নিমিত্তেই সৃষ্টি হয়েছে এই শাহবাগ স্কয়ার। প্রজন্ম চত্বর।
১৯৭৫ সালের বাকশাল যে ভুল করেছিল বর্তমানের বাকশাল সেই ভুলটি করতে চাচ্ছে না। ১৯৭৫ সালের বাকশাল জাতিকে গেলানোর চেষ্টা হয়েছিল কোনো রকম তরল ছাড়াই। ধারণা ছিল নেতা হুমকি দিলেই জাতি তা গিলবে। জাতি তা উগলে দিয়েছে। কাজেই এবার এমনভাবে গেলানো হবে জাতি যাতে টের না পায় যে তারা বাকশাল গিলে ফেলেছে। এর জন্য সহযোগী হয়েছে বুঝে বা না বুঝে শাহবাগ স্কয়ারের এই তারুণ্য।

এজন্য যুদ্ধাপরাধী মামলার স্পর্শকাতরতা দিয়ে প্রথমেই জাতির মুখটি বন্ধ করে ফেলার চেষ্টা চলছে। সব মানব প্রজ্ঞাকে বিদায় দিয়ে আবেগের বুলডোজার আমদানি করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমান সময়ের প্রধান দাবি তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটি সম্পূর্ণ চাপা পড়ে গেছে। পদ্মা সেতু বা সাঁকোর উপর দিয়ে পার হওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে জনগণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কাদের মোল্লাকে জীবন সাঁকোর অপর পারে পাঠানোর উদ্দেশে। দরবেশ বাবাজি, হলমার্ক ও আবুলদের সঙ্গে পাঠানোর শ্লোগান থাকলে না হয় একটা কথা ছিল।

অভিযোগ উঠেছে, গলাকাটা পাসপোর্টের মতো একজনের নাম অন্য জনের শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এই অভিযোগগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে পারেনি প্রসিকিউশন। হামান দিস্তা বা বুলডোজার দিয়ে অনেক কিছুই গুঁড়িয়ে দেয়া যায়, কিন্তু মানুষের বিশ্বাসকে টলানো যায় না। আওয়ামী লীগের এমপি রনি প্রসিকিউশনের দুর্বল দিকগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এগুলো নিয়ে উচ্চতর আদালতে আরও বিব্রত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই তরুণ সংসদ সদস্য। মনে হচ্ছে, প্রসিকিউশনের দুর্বলতাকে সরকার ‘শাহবাগ স্কয়ার’ দিয়ে পূরণ করতে চাচ্ছে।

শাহবাগ স্কয়ার সবচেয়ে মুশকিলে ফেলেছে সম্ভবত বিএনপিকে। সরকারের এই রাজনৈতিক কৌশল বা তীরটির মূল টার্গেট বিএনপি। তবে যে শক্তি দিয়ে বিএনপিকে আঘাত করতে চাচ্ছে সেই শক্তি দিয়েই সরকারকে কাবু করা সম্ভব। কাজেই চুপ না থেকে বিএনপির নৈতিক অবস্থানটি পরিষ্কার করতে হবে। এ কারণে আঠারো দল কিংবা জনগণ কারও সামনেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে না। কারণ বিএনপির নৈতিক অবস্থানের পক্ষেই আছে আন্তর্জাতিক মহল ও মানব প্রজ্ঞার অবস্থান।

১৯৭৩ সালের কোলাবেরটর বা দালাল আইনে যে ২৮০০০ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, আজকের অভিযুক্তদের একজনও সেই তালিকায় ছিলেন না বলে জানিয়েছেন তখনকার চিফ প্রসিকিউটর খন্দকার মাহবুব হোসেন। তার এই দাবিকে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। ডিজিটাল এই যুগে বিশ্ববাসীকে অন্ধকারে রাখার সুযোগ নেই। সরকার যাকে বহির্বিশ্বের চাপ বলছে তা মূলত আন্তর্জাতিক মহলের যথাযথ উদ্বেগ।

মাইকেল ক্রস নামক এক ব্রিটিশ নিউজ এডিটর লিখেছেন, Beyond the obvious point that any miscarriage of justice involving the death penalty should be a matter of concern , the Dhaka tribunal raises two issues. One is the abuse of the term ‘ international’ which should be reserved for war crimes proceedings under genuinely international jurisdiction. The other is the potential for political over-spill. Jamaat-e-Islami is a political force in some parts of UK , and while I have little sympathy with its members I would not like them to be handed a victim card to play.

অর্থাত্—স্পষ্টতই ন্যায়বিচারের কোনো রূপ স্খলন হেতু যদি কোনো মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় তবে তা আন্তর্জাতিক মহলের জন্য দারুণ উদ্বেগের কারণ হবে। ঢাকার ট্রাইব্যুনালটি দুটি প্রশ্নের উদ্রেক করে। প্রথমটি হলো আন্তর্জাতিক শব্দটির অপব্যবহার। কারণ এই পরিভাষাটি শুধু আন্তর্জাতিক জুরিসডিকশনের তদারকিতে অনুষ্ঠিত অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জন্যই সংরক্ষিত থাকা উচিত। অন্যটি হলো সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। জামায়াতে ইসলামী যুক্তরাজ্যের কোনো কোনো অংশে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এদের সদস্যদের প্রতি আমার খুব সামান্যই সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু এরা কারও হাতে অবিচারের শিকার হোক তা আমি চাই না।

মাইকেল ক্রস তার সেই নিবন্ধে নুরেমবার্গ বিচারের প্রধান প্রসিকিউটর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচারপতি রবার্ট জ্যাকসনের একটি উদ্ধৃতি টেনেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের আগে আগে রবার্ট জ্যাকসন বলেছিলেন, It would be better to shoot Nazi leaders out of hand than pervert the process of law by setting up a sham court. তিনি আরও বলেছেন, You must put no man on trial under the forms of judicial proceedings if you are not willing to see him freed if not proven guilty.

অর্থাত্—‘প্রহসনের আদালতে বিচারের পুরো প্রক্রিয়াটিকে বিকৃত বা কলঙ্কিত করার চেয়ে অভিযুক্তদের কোনো বিচার ছাড়া গুলি করে মেরে ফেলাই উত্তম।’ আর ‘যদি অপরাধ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুুত না থাক, তবে কাউকে বিচারের আওতায় এনো না।’

সরকার প্রযোজিত ও সুশীল লীগ পরিচালিত শাহবাগ স্কয়ারের এই নাটক দেখে মনে হচ্ছে, রবার্ট জ্যাকসনের এই পরামর্শটি মানলে সরকার অনেক ভালো করত। কাজেই আন্তর্জাতিক শব্দটির অপব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক মহল চুপ করে থাকবে না। তখন শাহবাগ স্কয়ার থেকে নেয়া এই ‘মনোবল’ খুব বেশি কাজে দেবে না।

কাজেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের উচিত হবে সুশীল লীগের প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে জোর কদমে অগ্রসর হওয়া। শাহবাগ স্কয়ারের নামে শাহবাগ নাটকের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যগুলো জনগণের বোধগম্য ভাষায় বুঝিয়ে বলতে হবে। এদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ প্রায় পুরোটাই আওয়ামী কব্জায়। কাজেই সারা দেশের দেশপ্রেমিক নাগরিক সমাজকে দ্রুত কার্যকর করতে হবে। চেতনাপন্থী সুশীল লীগের মতলবি প্রচারণা থেকে সব কর্মী ও নেতাদের মুক্ত রাখতে হবে। যে চেতনাপন্থীরা স্বাধীনতার ঘোষকের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাদের কাছ থেকে দেশপ্রেমিক শক্তি কখনই প্রশংসা পাবে না। ওদের প্রশংসায় যেমন পুলকিত হওয়া ঠিক হবে না, তেমনি ওদের গালিতে মন খারাপ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

দেশের অভ্যন্তরে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে দেশপ্রেমিক শক্তি রয়েছে তাদের ভোকাল বা সরব হতে হবে। সবার মুখটি খুলতে হবে। ইন্টারনেটে নিজের মতটি বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে হবে। শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ও প্রশাসকসহ সমাজের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। আবেগ নয়, যুক্তির ভাষায় নিজেদের অবস্থানটি তুলে ধরতে হবে।
এই দেশটি আওয়ামী লীগের নয়। এই দেশটি বিএনপির নয়। এই দেশটি জামায়াতের নয়। এই দেশটি আমাদের সবার।

আমাদের অবস্থান আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের অবস্থান বিএনপির বিরুদ্ধে নয়। আমাদের অবস্থান জামায়াতের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের অবস্থান বাকশালের বিরুদ্ধে। আমাদের অবস্থান এক দলীয় শাসনের বিরুদ্ধে। আমাদের অবস্থান স্বৈরতান্ত্রিক সব নিপীড়নের বিরুদ্ধে।

মুক্ত চিন্তা, গণতন্ত্র ও ন্যায়ের পক্ষে যারা থাকে তাদের জয় অনিবার্য। খুশির কথা, ওরা তাহরির স্কয়ারকে এ দেশের মানুষের অনুভবে এনে দিয়েছে। কাজেই নকল তাহরির স্কয়ার ভেঙে আসল তাহরির স্কয়ারের আবির্ভাব সময়ের অনিবার্য দাবি। সাইনবোর্ড দেখে নয়। জনগণ চেনে নেবে কণ্ঠের আওয়াজ শুনে।


লেখাটি লিখেছেনঃ  মিনার রশীদ
minarrashid@yahoo.com
আমার দেশ

1 comment: